গত এক দশক ধরে বাংলাদেশসহ এশিয়ার যেসব দেশ জনবল ও কর্ম দিয়ে অগ্রসরমান অর্থনীতির ধারায় আছে, তাদের অগ্রগতির অন্যতম চালিকা শক্তি হচ্ছে ‘মধ্যবিত্ত’। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের হার ধীরে ধীরে বাড়ছে। আর এই পরিবর্তনকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্রের হার কমে আসা মানেই হচ্ছে, যারা আগে দরিদ্র ছিলো তাদের মধ্য থেকে কিছু মানুষ এখন দারিদ্রের চক্র থেকে বের হয়ে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে যোগ দিচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)’র জুন ২০১৯ সালের হিসেব মতে, জুন মাসের শেষে দেশের দারিদ্র্য হার সাড়ে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৮ সালের জুন মাস শেষে এই হার ছিল ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। গত জুন শেষে অতি দারিদ্র্য হার নেমেছে সাড়ে ১০ শতাংশে। এক বছর আগে এর হার ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।

বিবিএস আরও বলছে, গত ১০ বছরে প্রায় এক কোটি মানুষ হতদরিদ্র অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। সরকারি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১০ সালে দেশে হতদরিদ্র ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৮ লাখ। ২০১৯ সালের জুন মাস শেষে অতি গরিব বা হতদরিদ্র ব্যক্তির সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখের কিছুটা বেশি। বাংলাদেশে এখন ১৬ কোটি ৪৬ লাখ জনগোষ্ঠী আছে। সব মিলিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে সোয়া তিন কোটি মানুষ।

করোনাভাইরাস ও এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব উপরের ওই হিসেব যে এলোমেলো করে দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সবচেয়ে বড় সামাজিক বিপর্যয় বলে ইতিমধ্যে করোনা সঙ্কটকে আখ্যা দিতে শুরু করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দায়িত্বশীল বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো। নানা হিসাব আর সম্ভাব্য ক্ষতি-করণীয় নির্ণয়ে ব্যস্ত তারা। তাদের প্রকাশিত ও প্রচারিত নানা বিশ্লেষণের সারমর্মে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির দুর্দশার করুণ চিত্র।

‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বলে পরিচিত মানব জাতির বসবাসের একমাত্র এই গ্রহ পৃথিবীতে কিছুদিন আগেও বিভিন্ন ধনী রাষ্ট্রগুলো তাদের মতো করে তাদের সমৃদ্ধির ছক একে নিশ্চিন্ত ছিল। আর বাংলাদেশসহ উদীয়মান দেশগুলো সেইসব ধনী দেশের নিম্ন-মধ্য পর্যায়ের সহায়ক কর্মশক্তি হিসেবে কাজ করে রেমিট্যান্স, গার্মেন্টস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা খাত থেকে আয় করে আসছিল। কিন্তু এই করোনাভাইরাস সব দেশের মধ্যে বৈষম্য ভিত্তিক হলেও মোটামুটি মানিয়ে নেয়া ওই অর্থনৈতিক ইকো সিস্টেমকে প্রায় এলোমেলো করে দিয়েছে। যার প্রথম ধাক্কা এসে পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে, এরপরে হয়তো অপেক্ষা করছে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার সুনামী টাইপ বিপর্যয়।

মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের পরে বিজয়ের পর থেকে ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে এ দেশে প্রায় অর্ধেক মানুষই হতদরিদ্র ছিল, যার হার প্রায় ৪৮ শতাংশ ছিল। আর দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত সাড়ে ৮২ শতাংশ মানুষ। নব্বইয়ের দশকের আগ পর্যন্ত এই পরিস্থিতির খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে নানামুখী দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি নেওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। দারিদ্র্য হটানোর নানা কর্মসূচি আরও বেশি গতি পায় ২০০০ সালের পর। তবে বর্তমান এই করোনা সঙ্কট পেছনের দিকে নিয়ে যাবার অশনি সঙ্কেত দিচ্ছে বললে ভুল হবে না।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায় মধ্যবিত্ত আমরা তাদেরই ধরব, যারা নির্ধারিত আয়ের প্রতিনিধিত্ব করে। অর্থাৎ মাস শেষে বেতন পায়। বেতনের বাইরে বিকল্প আর কোনো আয়ের সুযোগ নেই। সন্তানের স্কুল খরচ ও স্বাস্থ্য খরচ বেড়ে গেলে যাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, তারাই সমাজে মধ্যবিত্ত। এই সামাজিক বৃত্তের মধ্যে থেকে নিজের জায়গা একটু বাড়াতে বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণীটির প্রধানত দুটি কারণে বিস্তৃতি ঘটছে বলে অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন। প্রথমত: বাংলাদেশে কৃষির বাইরে কিছু কিছু মানুষ চলে আসছে যারা হয় পড়ালেখা করে চাকরি করছে, না হয় কেউ ব্যবসা করছে, আবার কেউ কেউ স্বাধীন পেশা গ্রহণ করছে। আর দ্বিতীয় কারণ: এখন শুধুমাত্র পরিবারের পুরুষ সদস্যই উপার্জনে যোগ দিচ্ছে না। তাদের সাথে নারীরাও প্রায় সমহারে উপার্জনে অংশ নিচ্ছে।

এবার আসা যাক মধ্যবিত্তের আসন্ন সঙ্কট প্রেক্ষাপট নিয়ে। দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত- এইসব সামাজিক বিভাজন আসলে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর নির্ভরশীল। একুশ শতকের শুরু থেকেই বদলে যেতে থাকে মধ্যবিত্ত সমাজের প্রচলিত আদর্শ, ধ্যান-ধারণা জীবনবোধ। শুধু বিত্তের বাইরেও আদর্শ আর রুচি বোধের এক চমৎকার সম্মিলন ঘটিয়ে শিক্ষা–শিল্প–সংস্কৃতি ইত্যাদি সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নিজেদের জড়িয়ে প্রমাণ করে যাচ্ছিল, ‘খেয়ে পরে বেঁচে থাকার বাইরেও একটা জীবন আছে।’ মৌলিক চাহিদা মেটানোর পরে হাতে থাকা বাড়তি কিছু অর্থের মাধ্যমে তারা ওইসব সৃজনশীল কর্মে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিল। ই-কমার্স, মোবাইল, ফ্যাশন, ভ্রমণ, প্রকাশনাসহ নানা খাতকে মূলধারার খাতে টেনে নিয়ে আসায় মধবিত্তের এক বড় ভূমিকা রয়েছে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির আদর্শ ও মূল্যবোধ এতোটাই শক্ত আর মুখচোরা যে, অভাবে পড়লেও তারা অনেকসময় হাত পাততে দ্বিধাবোধ করে আমৃত্যু। করোনার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্ভাব্য সুনামী আসলে ওইখানেই আঘাত করবে।

আইএলওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্ম হারানো মানুষের যে সংখ্যা ও পরিসংখ্যান প্রকাশ করছে, সে সংখ্যার একটি বড় অংশ হতে যাচ্ছে এই মধ্যবিত্ত। বাড়তি অর্থতো থাকবেই না, বরং মৌলিক চাহিদা মেটানো নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশের অগ্রসরমান মধ্যবিত্তও সেই ঝুঁকির বাইরে না। দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি হয়তো নানা সাহায্য সহযোগিতা নয়তো নানা রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বলয়ের মধ্যে দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে যাবে, কিন্তু কয়েক দশকের অভ্যাস আর মনস্তাত্ত্বিক গঠনের কারণে ‘অন্য ধরনের কাজ’ আর ‘সাহায্য নেয়া’ থেকে বেশ কিছু সময় বিরত থেকে গোপনে যুদ্ধ করবে দেশের মধ্যবিত্ত। ওই যুদ্ধে হয়তো একটি নির্দিষ্ট সংখ্যত মানুষ টিকে যাবে, তবে বেশিরভাগই যে পরাজিত হয়ে বিলুপ্ত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

করোনা যে শুধু শঙ্কাই নিয়ে আসছে তা না, সম্ভাবনাও হয়তো নিয়ে আসছে। উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও গরিব শ্রেণি সকলেই করোনার শিকার হতে শুরু করেছে।  এখন সবাই দেশ নিয়ে ভাবছে, অভ্যন্তরীণ অগ্রগতি আর বিপদের সময় নিজস্ব প্রযুক্তি-সম্পদের ব্যবহার করে টিকে থাকতে দেশের খাদ্য উৎপাদন, চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করাসহ নানা বিষয়ে ভাবার তাগিদ দেখা দিয়েছে করোনা সঙ্কটের সময়ে।  সরকারি পলিসি ও প্রণোদনার মাধ্যমে দেশের কৃষিখাত, করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক কোনো কর্মচাহিদা, নিজস্ব লাগসই উন্নয়নসহ নানা ধারায় সৃজনশীল আর অদম্য এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর বাইরে আসলে কোনো বিকল্পও নেই তাদের সামনে। এ যেনো নৌকা ডুবিয়ে দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি, কারণ পেছনে শুধুই মৃত্যু থাকায় ফিরে যাবার উপায় নেই।